
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে যাওয়াকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ডায়াবেটিস ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে এ সমস্যা হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে অনেক ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভারের অবস্থা উন্নত করা সম্ভব।
আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ ডা. হানসাজির পরামর্শে প্রকাশিত ২১ দিনের একটি পরিকল্পনায় খাবার, শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম ও ঘুমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ২১ দিনে ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি সেরে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এই সময়কে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস শুরু করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
১. চিনিযুক্ত পানীয় বাদ দিন
কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত ফলের জুস ও অন্যান্য চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে সম্পূর্ণ ফল খাওয়া যেতে পারে। আমলকি, পেয়ারা, কমলা ও পেঁপের মতো ফলে আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে।
২. সুষম খাবার খান
খাবারের প্লেটের অর্ধেক শাকসবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ পূর্ণ শস্য বা স্বাস্থ্যকর শর্করা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ক্যালরি, পরিশোধিত শর্করা ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নিন
কাঠবাদাম, আখরোট, তিসিবীজ ও কুমড়ার বীজের মতো বাদাম ও বীজ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। অন্যদিকে অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করা ভালো।
৪. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাঁটার পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা যেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করার পরামর্শও বিভিন্ন চিকিৎসা নির্দেশনায় রয়েছে।
৫. যোগব্যায়াম ও শ্বাসের ব্যায়াম করুন
যোগব্যায়াম ও শ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমানো এবং সামগ্রিক সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে। তালাসন, কোণাসন, বক্রাসন, পবনমুক্তাসন, ডায়াফ্রামেটিক শ্বাস-প্রশ্বাস, অনুলোম-বিলোম ও ভ্রমরী প্রাণায়ামের মতো ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে শারীরিক সমস্যা থাকলে ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. রাতে দেরি করে খাবেন না
ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করার চেষ্টা করা যেতে পারে। রাতে অপ্রয়োজনীয় নাশতা ও অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা ভালো।
৭. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ঘুমকে গুরুত্ব দিন
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে ওজন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের মোট ওজনের প্রায় ৫ শতাংশ কমলেও লিভারে জমা চর্বি কমতে পারে। আর ৫ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানো লিভারের চর্বি ও প্রদাহ কমাতে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভারের ক্ষতির অগ্রগতি ধীর করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে দ্রুত ওজন কমানোর পরিবর্তে ধীরে ও নিরাপদভাবে ওজন কমানো উচিত। পাশাপাশি নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
৮. অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই লিভারের সমস্যা থাকলে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার শুধু খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ ও অতিরিক্ত ওজনের মতো বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই এসব সমস্যা থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু ঘরোয়া উপায় অনুসরণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের অবস্থা এবং ক্ষতির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২১ দিনের কোনো পরিকল্পনাকে ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি সারিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ—দীর্ঘমেয়াদে এসব অভ্যাসই লিভারের সুস্থতার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।